Select Page

উপস্থাপনা: রমজানের প্রথম তারাবীহ আমাদের জন্য এক নতুন শুরুর বার্তা নিয়ে আসে। মসজিদের মিনার থেকে ভেসে আসা দীর্ঘ তিলাওয়াত শুনতে শুনতে আমাদের মনে হতে পারে এটি কেবলই একটি অনুষ্ঠান। কিন্তু আজ রাতে যখন ইমাম সাহেব তিলাওয়াত শুরু করবেন,তখন চোখ বন্ধ করে ভাবুন- মহাবিশ্বের মালিক আজ সরাসরি আপনার অস্তিত্ব নিয়ে কথা বলছেন। তিনি আপনাকে বলছেন আপনি কেন এই পৃথিবীতে এসেছেন এবং কোন পথে চললে এই অন্ধকার দুনিয়ায় আপনি আলোর দিশা পাবেন । আজকের তিলাওয়াত থেকে আমল (আয়াতের ভাবার্থ ও সংক্ষিপ্ত শিক্ষা )

الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَلَمِينَ ) الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ مُلِكِ يَوْمِ الدِّينِ إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ

১. সূরা ফাতিহা (১-৭): এটি কেবল একটি সূরা নয়, বরং বান্দা ও আল্লাহর মধ্যে একটি গভীর প্রেমের আলাপ। আপনি যখন বলেন ‘আলহামদুলিল্লাহ’, আল্লাহ তখন গর্ব করে ফেরেশতাদের বলেন, “আমার বান্দা আমার প্রশংসা করেছে।’ প্রতিটি ‘আমীন’ বলার সময় অনুভব করুন আপনি আল্লাহর সাথে এক জান্নাতি চুক্তিতে আবদ্ধ হচ্ছেন।

শিক্ষা: আল্লাহর সাথে সম্পর্কটা কেবল নিয়ম পালনের নয়, বরং পরম ভালোবাসার ও গভীর বন্ধুত্বের হতে হবে ।

২. সফল ব্যক্তিদের বৈশিষ্ট্য : কুরআন আপনার জীবনের প্রতিটি সংকটে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার এক ঐশ্বরিক গাইডবুক। দুনিয়ার মাপকাঠিতে সফল হওয়া খুব সহজ, কিন্তু আল্লাহর চোখে সফল হওয়ার জন্য নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। যারা এই গুণের অধিকারী, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েছে অফুরন্ত প্রশান্তি । (সূরা বাকারা, আয়াত-৩ ও ৪)

الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ وَيُقِيمُونَ الصَّلاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ وَالَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ وَبِالْآخِرَةِ هُمْ يُوقِنُونَ

যারা গায়েবের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং নামায প্রতিষ্ঠা করে। আর আমি তাদেরকে যে রিযিক দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে। এবং যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে সেসব বিষয়ের উপর যা কিছু আপনার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে (কোরআন) এবং সেসব বিষয়ের উপর যা তোমার পূর্ববর্তীদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে (তাওরাত, যাবুর, ইঞ্জিল ইত্যাদি)। আর আখেরাতকে যারা নিশ্চিত বলে বিশ্বাস করে।

শিক্ষা: জীবনের সকল জটিলতায় মানুষের বুদ্ধির ওপর নির্ভর না করে কুরআনের সমাধানকে চূড়ান্ত বলে গ্রহণ করতে হবে। প্রকৃত সফলতা ব্যাংক ব্যালেন্স বা ক্ষমতায় নেই, বরং আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাস ও সেবামূলক কাজে রয়েছে।

৩. আল-কুরআনের চ্যালেঞ্জ (সুরা বাকারা, আয়াত-২৩)

وَإِن كُنتُمْ فِي رَيْبٍ مِمَّا نَزَّلْنَا عَلَى عَبْدِنَا فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِّن مِثْلِهِ وَادْعُوا شُهَدَاءَكُم مِّن دُونِ

اللهِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ

এতদসম্পর্কে যদি তোমাদের কোন সন্দেহ থাকে যা আমি আমার বান্দার প্রতি অবতীর্ণ করেছি, তাহলে এর মত একটি সূরা রচনা করে নিয়ে এস। তোমাদের সেসব সাহায্যকারীদেরকে সঙ্গে নাও-এক আল্লাহকে ছাড়া, যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাকো। (সুরা বাকারা, আয়াত-২৩)

8. আল্লাহ তাআলা মানুষকে তার প্রতিনিধি করেছেন: সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল, কিন্তু আল্লাহ আপনার সক্ষমতার ওপর ভরসা রেখেছিলেন। আপনি এই পৃথিবীতে কোনো সাধারণ প্রাণী নন, বরং আপনি সৃষ্টির সেরা এবং আল্লাহর বিশেষ প্রতিনিধি। (সূরা বাকারা, আয়াত-৩০)

وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلائِكَةِ إِنِّي جَاعِلٌ فِي الأَرْضِ خَلِيفَةً قَالُوا أَتَجْعَلُ فِيهَا مَن يُفْسِدُ فِيهَا

وَيَسْفِكُ الدِّمَاء وَنَحْنُ نُسَبِّحُ بِحَمْدِكَ وَنُقَدِّسُ لَكَ قَالَ إِنِّي أَعْلَمُ مَا لَا تَعْلَمُونَ

আর তোমার পালনকর্তা যখন ফেরেশতাদিগকে বললেন: আমি পৃথিবীতে একজন প্রতিনিধি বানাতে যাচিছ, তখন ফেরেশতাগণ বলল, তুমি কি পৃথিবীতে এমন কাউকে সৃষ্টি করবে যে দাঙ্গা-হাঙ্গামার সৃষ্টি করবে এবং রক্তপাত ঘটাবে? অথচ আমরা নিয়ত তোমার গুণকীর্তন করছি এবং তোমারা পবিত্র সত্তাকে স্মরণ করছি। তিনি বললেন, নি:সন্দেহে আমি জানি, যা তোমরা জান না। (সূরা বাকারা, আয়াত-৩০)

শিক্ষা: নিজেকে কখনো তুচ্ছ বা মূল্যহীন ভাববেন না; মনে রাখবেন, আল্লাহ আপনাকে পৃথিবীতে একটি মহান দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন।

৫. সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করা যাবে না: আমরা অনেক সময় নিজের স্বার্থে সামান্য একটু মিথ্যার আশ্রয় নেই বা সত্যকে ঘুরিয়ে বলি, যা আমাদের ঈমানকে দূষিত করে। মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো সে পাহাড়সম চাপের মুখেও সত্যের ওপর অটল থাকে এবং কোনো ধোঁকার আশ্রয় নেয় না। (সূরা বাকারাহ, আয়াত- ৪২)

وَلَا تَلْبِسُوا الْحَقَّ بِالْبَاطِلِ وَتَكْتُمُوا الْحَقَّ وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ

আর তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশিয়ে দিও না এবং জেনেশুনে সত্য গোপন করো না। (সূরা বাকারাহ, আয়াত- ৪২)

শিক্ষা: ব্যক্তিগত বা বৈষয়িক লাভের জন্য কখনো সত্যের সাথে আপস করা যাবে না, কারণ সত্যই মুক্তির পথ ।

৬. আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন: যখন পৃথিবী আপনার জন্য ছোট হয়ে আসে, তখন জানবেন যে আল্লাহ আপনার হাতের নাগালেই আছেন। ধৈর্যের ফল সব সময় মিষ্টি হয় কারণ এর সাথে খোদ আল্লাহর সরাসরি সমর্থন ও সাহচর্য যুক্ত থাকে। (সূরা বাকারাহ, আয়াত-১৫৩)

يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلوةِ إِنَّ اللهَ مَعَ الصُّبِرِينَ

হে মুমিনগণ! ধৈর্য ও সালাতের সাহায্য নাও, নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন। শিক্ষা : কঠিন পরিস্থিতিতে অস্থির না হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা এবং নামাজের মাধ্যমে স্থিরতা খোঁজা ঈমানের দাবি। (সূরা বাকারাহ, আয়াত-১৫৩)

৭. হালাল ভক্ষণের নির্দেশ:

আমাদের রক্তে যেন হারামের একটি কণিকাতো প্রবেশ না করে, কারণ হারাম খাবার আমাদের দুআ কবুলের পথে দুর্ভেদ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়। হালাল উপার্জন কেবল পকেটের পবিত্রতা নয়, বরং এটি আমাদের আত্মার প্রশান্তির গ্যারান্টি। (সুরা বাকারা, আয়াত-১৬৮)

يَا أَيُّهَا النَّاسُ كُلُوا مِمَّا فِي الْأَرْضِ حَلاَلاً طَيِّباً وَلاَ تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ

مُّبِينٌ

হে মানব মন্ডলী! পৃথিবীর হালাল ও পবিত্র বস্তু-সামগ্রী ভক্ষণ কর । আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । সে নি:সন্দেহে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু । (সুরা বাকারা, আয়াত-১৬৮)

শিক্ষাঃ রিযিক অন্বেষণে শতভাগ সততা বজায় রাখা এবং উপার্জিত রিযিকের জন্য আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা মুমিনের দায়িত্ব ।

৮.

সাওম পালন প্রত্যেক সামর্থবান মুসলমানের উপর ফরজ: আয়াত-১৮৩)

(সুরা বাকারা,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ

হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর সওম ফরয করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা পরহেযগারী অর্জন করতে পার। (সুরা বাকারা, আয়াত-১৮৩)

৯.

আজকের দুআ মুমিনের প্রার্থনা হওয়া উচিত সর্বাঙ্গীণ, সে যেন দুনিয়াতে সম্মানের সাথে বাঁচে এবং আখিরাতে জান্নাত লাভ করে। ইব্রাহীম এর দুআ :

رَبِّنَا تَقَبَلُ مِنَا إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ

হে আমাদের রব! আমাদের থেকে কবুল কর। নিশ্চয়ই তুমি শ্রবণকারী, সর্বজ্ঞ বাকারা-১২৭)

(সূরা

رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ

হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দাও এবং আখেরাতে কল্যাণ দাও। আর আমাদেরকে দোযখের শাস্তি থেকে বাঁচাও। (সূরা বাকারা-২০১)

এই দোয়াটি আমাদের শেখায় যে ইসলাম কেবল পরকাল নিয়ে পড়ে থাকতে বলে না, বরং বর্তমান জীবনকেও অর্থবহ করতে বলে । আমরা যেন দুনিয়ার সাফল্যকে আখিরাতের সাফল্যের সোপান হিসেবে ব্যবহার করতে পারি, এটাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত।

১০. আজকের তেলাওয়াত থেকে প্রাপ্ত আমলনামা

ক।

মিষ্টি কথা : আজ অন্তত ৫ জন মানুষের সাথে কথা বলার সময় খেয়াল রাখব যেন আমার কণ্ঠে কোনো বিরক্তি না থাকে (বাকারাহ-৮৩)।

খ। ধৈর্যের সালাত: আজ কোনো কারণে রাগ বা মেজাজ খারাপ হলে তাৎক্ষণিক উত্তর না দিয়ে দুই রাকাত নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইব (বাকারাহ-৪৫)।

গ। হালাল চেক: আজ সারাদিন যা খাব বা কিনব, তার উৎস পুরোপুরি হালাল কি না তা একবার যাচাই করে নেব (বাকারাহ-১৭২)

ঘ। হৃদয়ের দুআ ইফতারের ঠিক ১০ মিনিট আগে সব কোলাহল ছেড়ে একা বসে সূরা বাকারার ১৮৬ নম্বর আয়াতটি মনে করে আল্লাহর কাছে আমার সবচেয়ে গোপন চাওয়াগুলো বলব ।

ঙ। সফলতার সংজ্ঞায়ন: ঘুমানোর আগে আজ ভাবব আমি আল্লাহর চোখে ‘সফল’ মুমিনদের ৫টি গুণের (বাকারাহ ৩-৫) কতটা অর্জন করতে পেরেছি।

আজকে মহান রবের কাছে আমাদের প্রার্থনা: হে আল্লাহ, আজকের তারাবীহ্ যেন কেবল আমার কানে না পৌঁছায়, বরং আমার রূহকে জাগিয়ে দেয়। আমার জীবনকে কুরআনের মুক্তোর আলোয় উদ্ভাসিত করে দাও। আমিন।

Need Help? Chat with us